বিপ্লবের দুই পিঠ: দাম্ভিকতায় ডুবল নৌকা, ক্ষমতার লোভে পথ হারাল জেন-জি!

ultrasonicboom February 21, 2026 Politics Bangladesh
বিপ্লবের দুই পিঠ: দাম্ভিকতায় ডুবল নৌকা, ক্ষমতার লোভে পথ হারাল জেন-জি!

বিপ্লবের দুই পিঠ: দাম্ভিকতায় ডুবল নৌকা, ক্ষমতার লোভে পথ হারাল জেন-জি!

নিজস্ব প্রতিবেদক | বঙ্গদর্শন |

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই মাস যেন এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের একটি নিরীহ দাবি কীভাবে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ৫ আগস্ট দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরতান্ত্রিক আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটাল, তা রূপকথাকেও হার মানায়। শেখ হাসিনার তড়িঘড়ি করে দেশত্যাগ এবং 'মুনসুন রেভোলিউশন' বা 'জেন-জি বিপ্লব'-এর এই বিজয়গাথা আজ ইতিহাসের অংশ। কিন্তু বিপ্লবের ধুলো সরতেই বেরিয়ে আসছে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। একদিকে দাম্ভিকতা আর 'রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্ত' তত্ত্বে ফেঁসে গিয়ে একটি ঐতিহ্যবাহী দলের সলিল সমাধি, অন্যদিকে যে তরুণদের কাঁধে ভর করে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখেছিল বাংলাদেশ, সেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের ক্ষমতার মোহে পথ হারানো। বঙ্গদর্শনের এই বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই অমীমাংসিত অধ্যায়ের আদ্যোপান্ত।

অর্থনীতির কঙ্কাল ও ১৫ বছরের গুমোট হাওয়া

আওয়ামী লীগের পতনের বীজ পোঁতা ছিল তাদের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলের চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য আর ভোটাধিকার হরণের মাঝেই। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন সাধারণ মানুষের মনে যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, তা কেবল একটি স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায় ছিল।

📊 শ্বেতপত্রের চমকে দেওয়া তথ্য:

  • পতিত স্বৈরাচারের আমলে প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে।
  • ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি গিয়ে ঠেকে ১০.৮৯ শতাংশে
  • ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৯তম
  • সরকারি পরিসংখ্যান মতেই দেশে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ তরুণ বেকার ছিলেন!

যে ফাঁদে পা দিল আওয়ামী লীগ

২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট কোটা পুনর্বহালের রায় দেওয়ার পর থেকেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামে। কিন্তু ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ আওয়ামী লীগ সরকার এই নিরীহ দাবিকে 'রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্ত' হিসেবে আখ্যা দেয়। ১৭ জুলাই ওবায়দুল কাদেরের সেই বিখ্যাত হুংকার—'ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে প্রতিরোধ গড়ে তোলার' নির্দেশ—আদতে বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ যখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালাল, তখন আর এটি কেবল ছাত্রদের আন্দোলন রইল না; জনতা রাস্তায় নেমে এল।

🩸 আবু সাঈদ: যে বুলেট কাঁপিয়ে দিল মসনদ

১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ বুক পেতে দিয়েছিলেন বুলেটের সামনে। মাত্র ১৫ মিটার দূর থেকে পুলিশের ছোঁড়া ১২-গেজ শটগানের বার্ডশট অ্যামুনিশন (যা আন্তর্জাতিক আইনে বেআইনি) যখন তার বুক ঝাঁজরা করে দিল, তখন গোটা দেশের বিবেক কেঁপে ওঠে। 'শুট-অন-সাইট' নির্দেশ আর ইন্টারনেট শাটডাউনের মতো চরমপন্থা বেছে নিয়ে সরকার মূলত নিজেদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই আন্দোলনে ৮৫৮ জনেরও বেশি নিহত হন। যার ফলশ্রুতিতে ২০২৫ সালের মে মাসে নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে।

আগুনে পুড়ল রাষ্ট্র, ছাই হলো অর্থনীতি

সরকারের হঠকারী সিদ্ধান্তে দেশজুড়ে যে তাণ্ডব চলে, তাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের কল্পনাতীত ক্ষতি হয়।

খাতের নাম / স্থাপনা ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক মূল্য ও বিবরণ
সামগ্রিক অর্থনীতি ইন্টারনেট বন্ধ ও টানা ছুটিতে ৭৬,৭০০ থেকে ৮২,৬০০ কোটি টাকার ক্ষতি।
চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস ৯০০ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি; পণ্য ডেলিভারি বন্ধে হাজার কোটি টাকার লোকসান।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ৫৩টি গাড়ি ও ১৩টি বাইক ভস্মীভূত। ক্ষতি প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।
বিটিভি মূল্যবান আর্কাইভ ও সম্প্রচার সরঞ্জাম ধ্বংস। ক্ষতি ৪০০ কোটি টাকা।
বিআরটিএ (মিরপুর) ১২১ কোটি টাকার স্বয়ংক্রিয় ভেহিক্যাল ইন্সপেকশন কেন্দ্র সম্পূর্ণ ছাই।

বিপ্লবের পর পথ হারাল 'বৈষম্যবিরোধী' নাবিকেরা

৫ আগস্টের পর যে 'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন' নতুন বাংলাদেশের রূপকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যেই তারা দুর্নীতি, মব জাস্টিস, চাঁদাবাজি আর ক্ষমতার নগ্ন প্রদর্শনীতে জড়িয়ে পড়ে। ১৫৮ জনের বিশাল কমিটি থাকলেও ক্ষমতা কুক্ষিগত হয় মাত্র ৬-৭ জন নেতার হাতে (নাহিদ, আসিফ, হাসনাত, সারজিস, মাহফুজ, আরিফ ও মাসউদ)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোকে চরমভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়।

⚠️ জেলা পর্যায়ে কোন্দলের মহোৎসব

সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের মতবিনিময় সফরে বিভক্তি চরম আকার ধারণ করে:

  • রাজশাহী: স্বঘোষিত সমন্বয়ককে ছাত্রদল নেতাদের পিটুনি।
  • নওগাঁ: এনসিপি'র আধিপত্য ও জালিয়াতির প্রতিবাদে ব্যাপক গণপদত্যাগ।
  • খাগড়াছড়ি, কুমিল্লা, বরগুনা: আধিপত্য বিস্তার নিয়ে হাতাহাতি ও তুমুল হট্টগোল।
  • হবিগঞ্জ ও বগুড়া: রাজনৈতিক দলের বাধায় সভা পণ্ড।

চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য এবং ক্ষমতার নগ্ন রূপ

বরিশাল কোতোয়ালি থানায় ১৪ মে ২০২৫ তারিখে ২৪৭ জনের নামে মামলা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মারজুক আবদুল্লাহ। অভিযোগ ওঠে, এই মামলা পুঁজি করে তিনি ও মুখপাত্র সুমি হক নিরীহ মানুষদের ফাঁসিয়ে ৩ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করেন! অন্যদিকে, হবিগঞ্জের বানিয়াচং থানায় ছাত্রনেতা মাহদী হাসান সরাসরি ওসিকে অবরুদ্ধ করে হুমকি দেন, "বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম... আমরা এতগুলা ছেলে ভাইসা আসছি নাকি?"

মব জাস্টিস: জিম্মি রাষ্ট্রের করুণ চিত্র

৫ আগস্টের পর দেশজুড়ে শুরু হয় 'মব জাস্টিস'-এর ভয়ংকর সংস্কৃতি। এটিএন, একাত্তর, সময় টিভির মতো গণমাধ্যমে নজিরবিহীন হামলা চালানো হয়। ছাত্রনেতা আবদুল হান্নান মাসউদের নেতৃত্বে জাতীয় প্রেসক্লাব দখল হয়। সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে শিক্ষাঙ্গনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন তোফাজ্জল হোসেন এবং জাহাঙ্গীরনগরে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শামীম মোল্লাকে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ধানমন্ডিতে হামলাকারী মবকে পুলিশ ধরলে, খোদ ছাত্রনেতারাই গভীর রাতে মুচলেকা দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে আনেন।

উপদেষ্টাদের মসনদ: স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির নতুন উপাখ্যান

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে স্থান পাওয়া উপদেষ্টাদের কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষকে চরম হতাশ করেছে।

  • আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া: নিজ মন্ত্রণালয় (LGED) থেকে পিতাকে ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়া, নিজ জেলা কুমিল্লায় ২৪ বিলিয়ন টাকার প্রকল্প বরাদ্দ, বিমানবন্দরে ব্যাগে গুলি পাওয়া এবং বিসিবিতে নগ্ন হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়ে তিনি ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করেন।
  • মাহফুজ আলম: 'মাস্টারমাইন্ড' খ্যাত এই উপদেষ্টা মন্ত্রণালয়ে অনিয়মিত ছিলেন। গণমাধ্যম সংস্কারে চরম ব্যর্থতার পাশাপাশি দলীয় তোষণ করে নিজ অনুসারীদের টিভির লাইসেন্স দেওয়া এবং বড় ভাইকে রেড ক্রিসেন্টে বসানোর অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
  • নাহিদ ইসলাম: বিলাসী জীবনযাপন এবং ক্ষমতার বলয় তৈরি করে তিনি 'জাতীয় নাগরিক পার্টি' (NCP) গঠন করেন। অবশেষে জনরোষ এবং দুর্নীতির দায়ে ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর আসিফ ও মাহফুজ পদত্যাগে বাধ্য হন।

নারী ও সংখ্যালঘুদের কান্না: কোথায় গেল 'বাংলাদেশ ২.০'?

যে নারীরা পুলিশের টিয়ারশেল উপেক্ষা করে সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, ৫ আগস্টের পর তাদের সুপরিকল্পিতভাবে ক্ষমতার কাঠামো থেকে মুছে ফেলা হয়। জেন্ডার-ডাইভার্স সদস্যদের চরম অবমাননা করে কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়। পাশাপাশি, ৫ থেকে ২০ আগস্টের মধ্যে ১,০৬৮টি সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা হয়। পাহাড়ি আদিবাসী, সুফি মাজার ও আহমাদিয়া সম্প্রদায়ের ওপর কট্টর গোষ্ঠীর আক্রমণ প্রমাণ করে যে, এই ছাত্রনেতৃত্ব অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

বঙ্গদর্শনের পাঠকের কাছে প্রশ্ন:

যে রক্তের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদ মুক্ত হলো দেশ, সেই রক্ত কি নতুন মোড়কে আরেক শোষকের জন্ম দিল? 'বাংলাদেশ ২.০' কি তবে কেবলই একটি ফাঁকা বুলি? আপনার মতামত জানান কমেন্ট বক্সে।

বঙ্গদর্শন

খবর যেখানে কথা বলে

"আমরা খবর পড়িনা, শুনিনা, আমরা খবর বানাই।"

ভিজিট করুন: bongodarshan.com

Comments

Leave a Comment

No comments yet. Be the first to comment!